উদ্ভিদের বৃদ্ধি
১. উদ্ভিদের বৃদ্ধি
সংজ্ঞা: একটি উদ্ভিদ বা তার অংশের আকার, ভর এবং আয়তনের অপরিবর্তনীয় স্থায়ী বৃদ্ধি।
বৃদ্ধির প্রকারভেদ: ক) প্রাথমিক বৃদ্ধি
- শীর্ষস্থ মেরিস্টেমে ঘটে
- দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির ফলাফল
- মূল ও কান্ডে পাওয়া যায়
- প্রাথমিক উদ্ভিদ দেহের জন্য দায়ী
খ) গৌণ বৃদ্ধি
- পার্শ্বীয় মেরিস্টেমে ঘটে
- পরিধি/বেধ বৃদ্ধির ফলাফল
- দ্বিবীজপত্রী কান্ড ও মূলে পাওয়া যায়
- গৌণ উদ্ভিদ দেহ গঠন করে
বৃদ্ধির বৈশিষ্ট্য: ১. কোষ বিভাজন (মাইটোসিস) ২. কোষ প্রসারণ ৩. কোষ পৃথকীকরণ
উদ্ভিদের বৃদ্ধি সাধারণত অনির্দিষ্ট: ১. উদ্ভিদ বৃদ্ধির বৈশিষ্ট্য
- উদ্ভিদের তাদের সারা জীবন ধরে সীমাহীন বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে
- বৃদ্ধি অনির্দিষ্ট
- নির্দিষ্ট স্থানে মেরিস্টেমের উপস্থিতির কারণে
- “বৃদ্ধির উন্মুক্ত রূপ” বলা হয়
২. মেরিস্টেম
-
বিভাজন ও স্ব-স্থায়িত্বের ক্ষমতাসম্পন্ন কোষ ধারণ করে
-
দুটি প্রধান প্রকার: ক) প্রাথমিক মেরিস্টেম
- মূল শীর্ষ মেরিস্টেম
- কান্ড শীর্ষ মেরিস্টেম
- প্রাথমিক বৃদ্ধির জন্য দায়ী
- উদ্ভিদ অক্ষ বরাবর দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ঘটায়
খ) পার্শ্বীয় মেরিস্টেম
- সংবহন ক্যাম্বিয়াম
- কর্ক-ক্যাম্বিয়াম
- জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে দেখা যায়
- দ্বিবীজপত্রী ও জিমনোস্পার্মে পাওয়া যায়
- গৌণ বৃদ্ধির জন্য দায়ী
৩. বৃদ্ধির ধরণ
-
প্রাথমিক বৃদ্ধি
- অক্ষ বরাবর উদ্ভিদের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি
- শীর্ষস্থ মেরিস্টেম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত
-
গৌণ বৃদ্ধি
- পরিধি/বেধ বৃদ্ধি
- পার্শ্বীয় মেরিস্টেম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত
- দ্বিবীজপত্রী ও জিমনোস্পার্মে ঘটে
৪. কোষের বিকাশ
- মেরিস্টেম্যাটিক কোষগুলি অবিচ্ছিন্নভাবে বিভাজিত হয়
- কন্যা কোষগুলি বিভাজনের ক্ষমতা হারায়
- এই কোষগুলি স্থায়ী উদ্ভিদ দেহের কলা গঠন করে
২. বৃদ্ধি পরিমাপ
১. মৌলিক সংজ্ঞা:
- বৃদ্ধি প্রাথমিকভাবে কোষীয় স্তরে প্রোটোপ্লাজমের বৃদ্ধি
- প্রোটোপ্লাজম বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ পরিমাপ কঠিন
২. বৃদ্ধি পরিমাপের পরামিতি:
- সতেজ ওজন
- শুষ্ক ওজন
- দৈর্ঘ্য
- ক্ষেত্রফল
- আয়তন
- কোষ সংখ্যা
৩. বৃদ্ধির হার উদাহরণ: ক) ভুট্টার মূল:
- শীর্ষস্থ মেরিস্টেম প্রতি ঘণ্টায় ১৭,৫০০+ নতুন কোষ উৎপন্ন করে
- কোষ সংখ্যা বৃদ্ধি দ্বারা বৃদ্ধি পরিমাপ
খ) তরমুজ:
- কোষগুলি আকারে ৩৫০,০০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে
- কোষের আকার বৃদ্ধি দ্বারা বৃদ্ধি পরিমাপ
৪. নির্দিষ্ট বৃদ্ধি পরিমাপ:
- পরাগ নালী: দৈর্ঘ্য দ্বারা পরিমাপ
- পৃষ্ঠ-উদরীয় পাতা: পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল দ্বারা পরিমাপ
বৃদ্ধির ধরণ: ক) গাণিতিক বৃদ্ধি
- রৈখিক বৃদ্ধির ধরণ
- মূল/কান্ডের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধিতে সাধারণ
- সূত্র: L = L₀ + rt (L = দৈর্ঘ্য, L₀ = প্রাথমিক দৈর্ঘ্য, r = বৃদ্ধির হার, t = সময়)
খ) জ্যামিতিক বৃদ্ধি
- সূচকীয় বৃদ্ধির ধরণ
- ‘J’ বক্ররেখা দেখায়
- সূত্র: W = W₀ert (W = চূড়ান্ত আকার, W₀ = প্রাথমিক আকার, r = বৃদ্ধির হার, t = সময়)
গ) সিগময়েড বৃদ্ধি (S-বক্ররেখা) পর্যায়সমূহ: ১. অগ্রবর্তী পর্যায় (ধীর বৃদ্ধি) ২. লগ/সূচকীয় পর্যায় (দ্রুত বৃদ্ধি) ৩. স্থির পর্যায় (বৃদ্ধি বন্ধ)
পৃথকীকরণ, অপৃথকীকরণ এবং পুনঃপৃথকীকরণ:
ক) পৃথকীকরণ
- সংজ্ঞা: যে প্রক্রিয়ায় কোষগুলি নির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের জন্য পরিপক্ব হয়
- গাঠনিক পরিবর্তন: কোষ প্রাচীর ও প্রোটোপ্লাজমের পরিবর্তন
- উদাহরণ: ট্রাকিয়ারি উপাদান
খ) অপৃথকীকরণ
- সংজ্ঞা: জীবিত পৃথকীকৃত কোষগুলি বিভাজনের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে
- উদাহরণ: আন্তঃফ্যাসিকুলার ক্যাম্বিয়াম ও কর্ক ক্যাম্বিয়াম গঠন
গ) পুনঃপৃথকীকরণ
- সংজ্ঞা: অপৃথকীকরণ থেকে প্রাপ্ত কোষগুলি নির্দিষ্ট কার্যের জন্য পরিপক্ব হয়
- উদাহরণ: জাইলেম, ফ্লোয়েম, কর্ক, মজ্জা, কর্টেক্স
ঘ) অতিরিক্ত ধারণা:
- টিউমার: অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন থেকে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি
- ক্যালাস: কলা সংস্কৃতিতে বিভাজিত প্যারেনকাইমা কোষ
- উন্মুক্ত পৃথকীকরণ: কোষের অবস্থানের ভিত্তিতে বিভিন্ন গঠন
৩. উদ্ভিদে বিকাশ
১. সংজ্ঞা ও উপস্থাপনা
- বৃদ্ধি: ভর ও আকারের অপরিবর্তনীয় বৃদ্ধি
- বিকাশ: পরিপক্বতার দিকে নিয়ে যাওয়া গুণগত পরিবর্তন
- বৃদ্ধি নিম্নলিখিত মাধ্যমে পরিমাপ করা যেতে পারে:
- সতেজ/শুষ্ক ওজন
- দৈর্ঘ্য/উচ্চতা
- পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল
- কোষ সংখ্যা
২. প্লাস্টিসিটি
- পরিবেশের ভিত্তিতে উদ্ভিদের তাদের বৃদ্ধি পরিবর্তন করার ক্ষমতা বিষমপত্রীতা উদাহরণ:
- তুলা: কিশোর বনাম পরিপক্ব পাতা
- ধনিয়া: ভূমি-স্তরের বনাম কান্ডের পাতা
- লার্কস্পার: নিমজ্জিত বনাম বায়বীয় পাতা
৩. বৃদ্ধিকে প্রভাবিতকারী উপাদান
ক) বহিঃস্থ উপাদান:
১. আলো
- সালোকসংশ্লেষণের জন্য অপরিহার্য
- আলোকানুবর্তিতা প্রভাবিত করে
- ফুল ফোটানো প্রভাবিত করে
- ক্লোরোফিল সংশ্লেষণ নিয়ন্ত্রণ করে
২. তাপমাত্রা
- এনজাইম ক্রিয়াকে প্রভাবিত করে
- অঙ্কুরোদগমকে প্রভাবিত করে
- ফুল ফোটার সময় নিয়ন্ত্রণ করে
- বৃদ্ধির হারকে প্রভাবিত করে
৩. জল
- কোষের স্ফীতির জন্য অপরিহার্য
- সালোকসংশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয়
- পুষ্টি পরিবহনকে প্রভাবিত করে
- অঙ্কুরোদগমকে প্রভাবিত করে
৪. অক্সিজেন
- শ্বসনের জন্য প্রয়োজনীয়
- মূল বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ
- বীজ অঙ্কুরোদগমের জন্য প্রয়োজনীয়
খ) অন্তঃস্থ উপাদান (উদ্ভিদ হরমোন):
১. অক্সিন
- কান্ডের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করে
- শীর্ষস্থ আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করে
- মূল গঠন উদ্দীপিত করে
- পাতা পতন রোধ করে
২. জিব্বেরেলিন
- কান্ডের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করে
- বীজের সুপ্তাবস্থা ভঙ্গ করে
- ফুল ফোটানো প্ররোচিত করে
- ফল বিকাশ
৩. সাইটোকাইনিন
- কোষ বিভাজনকে উন্নীত করে
- বার্ধক্য বিলম্বিত করে
- পার্শ্বীয় কুঁড়ির বৃদ্ধি
- ক্লোরোপ্লাস্ট বিকাশ
৪. ইথিলিন
- ফল পাকানো
- ত্রি-প্রতিক্রিয়া
- পাতা পতন
- মূল রোম গঠন
৫. অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (ABA)
- সুপ্তাবস্থাকে উন্নীত করে
- রন্ধ্র বন্ধ
- চাপ প্রতিক্রিয়া
- বৃদ্ধি নিবারণ করে
৪. আলোককালবোধ
স্বল্পদিবসী উদ্ভিদ (SDP):
- রাতের দৈর্ঘ্য > সমালোচনামূলক সময়কাল হলে ফুল ফোটে
- উদাহরণ: চন্দ্রমল্লিকা, ধান
দীর্ঘদিবসী উদ্ভিদ (LDP):
- রাতের দৈর্ঘ্য < সমালোচনামূলক সময়কাল হলে ফুল ফোটে
- উদাহরণ: পালং শাক, গম
দিবস-নিরপেক্ষ উদ্ভিদ (DNP):
- দিবসের দৈর্ঘ্য থেকে স্বাধীনভাবে ফুল ফোটে
- উদাহরণ: টমেটো, তুলা
৫. শীতপ্রবণতা
- ফুল ফোটার জন্য শীতল চিকিত্সার প্রয়োজন
- সময়কাল প্রজাতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়
- উদাহরণ: শীতকালীন গম, বিট
- অকাল ফুল ফোটানো প্রতিরোধ করে
৬. বীজের সুপ্তাবস্থা
কারণ: ১. শক্ত বীজ আবরণ ২. অপরিপক্ব ভ্রূণ ৩. রাসায়নিক নিবারক ৪. আলোর প্রয়োজনীয়তা ৫. তাপমাত্রার প্রয়োজনীয়তা
সুপ্তাবস্থা ভঙ্গ করার পদ্ধতি: ১. স্ক্যারিফিকেশন
- যান্ত্রিক
- রাসায়নিক (অ্যাসিড চিকিত্সা)
২. স্তরীভবন
- শীতল চিকিত্সা
- আর্দ্র শীতলীকরণ
৩. অন্যান্য পদ্ধতি:
- আলোর সংস্পর্শ
- হরমোন চিকিত্সা
- নিবারক লিচিং
- তাপমাত্রার পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন