অধ্যায় ০১ দুঃখের অধিকার
মানুষের পোশাক তাদের বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করে দেয়। সাধারণত পোশাকই সমাজে মানুষের অধিকার এবং তার মর্যাদা নির্ধারণ করে। এটি আমাদের জন্য অনেক বন্ধ দরজা খুলে দেয়, কিন্তু কখনো এমনও পরিস্থিতি আসে যে আমরা একটু নিচু হয়ে সমাজের নিম্ন শ্রেণীর অনুভূতি বুঝতে চাই। সেই সময় এই পোশাকই বন্ধন এবং বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন বাতাসের ঢেউ কাটা ঘুড়িকে হঠাৎ মাটিতে পড়তে দেয় না, তেমনি বিশেষ পরিস্থিতিতে আমাদের পোশাক আমাদের নুইয়ে পড়তে বাধা দেয়।

বাজারে, ফুটপাথে কিছু তরমুজ ডলিয়াতে এবং কিছু মাটিতে বিক্রির জন্য রাখা মনে হচ্ছিল। তরমুজের কাছে এক মধ্যবয়সী মহিলা বসে কাঁদছিল। তরমুজ বিক্রির জন্য ছিল, কিন্তু সেগুলো কিনতে কেউ কীভাবে এগোবে? তরমুজ বিক্রি করা মহিলাটি তো কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে মাথা হাঁটুর উপর রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।
পাশের দোকানের তক্তায় বসে বা বাজারে দাঁড়িয়ে লোকেরা ঘৃণা করে সেই মহিলার সম্পর্কে কথা বলছিল। সেই মহিলার কান্না দেখে মনে এক ব্যথা জেগে উঠল, কিন্তু তার কান্নার কারণ জানার উপায় কী ছিল? ফুটপাথে তার কাছে বসতে পারার পথে আমার পোশাকই বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
এক লোক ঘৃণা করে একদিকে থুথু ফেলতে ফেলতে বলল, “কী যুগ এসেছে! যুবক ছেলেটির মৃত্যুর পুরো দিনও কাটেনি আর এই বেহায়া দোকান লাগিয়ে বসেছে।”
দ্বিতীয়জন তার দাড়ি খুঁটতে খুঁটতে বলছিলেন, “আরে যেমন নিয়ত হয় আল্লাহও তেমনই বরকত দেন।”
সামনের ফুটপাথে দাঁড়ানো এক লোক দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে কান খুঁটতে খুঁটতে বলল, “আরে, এদের আবার কী? এই কামিনে লোক রুটির টুকরোর জন্য প্রাণ দেয়। এদের জন্য ছেলে-মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী, ধর্ম-ঈমান সব রুটির টুকরো।”
পারচুনের দোকানে বসে লালাজি বললেন, “আরে ভাই, তাদের জন্য মরা-বাঁচার কোনো মানে না থাকলেও, পরের ধর্ম-ঈমানের তো খেয়াল করা উচিত! যুবক ছেলে মারা গেলে তেরো দিনের সূতক হয় আর সে এখানে রাস্তায় বাজারে এসে তরমুজ বিক্রি করতে বসে গেছে। হাজার লোক আসে-যায়। কে জানে যে তার বাড়িতে সূতক আছে। কেউ তার তরমুজ খেয়ে ফেললে তার ঈমান-ধর্ম কীভাবে থাকবে? কী অন্ধকার!”
পাশ-পড়োশের দোকান থেকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল- তার তেইশ বছরের যুবক ছেলে ছিল। বাড়িতে তার বৌ এবং নাতি-নাতনি আছে। ছেলে শহরের কাছে দেড় বিঘা জমিতে শাকসবজির চাষ করে পরিবারের নির্বাহ করত। তরমুজের ডলিয়া বাজারে পৌঁছে দিয়ে কখনো ছেলে নিজে সওদার পাশে বসে যেত, কখনো মা বসে যেত।
ছেলে পরশু সকালে ভোরের অন্ধকারে লতায় থেকে পাকা তরমুজ বাছছিল। ভেজা মেডের শীতলতায় বিশ্রামরত একটি সাপের উপর ছেলের পা পড়ে গেল। সাপ ছেলেকে দংশন করল।
ছেলের বুড়ি মা পাগলের মতো ওঝাকে ডেকে আনল। ঝাড়-ফুঁক করা হল। নাগদেবের পূজা হল। পূজার জন্য দান-দক্ষিণা চাই। বাড়িতে যতটা আটা এবং
ধান ছিল, দান-দক্ষিণায় উঠে গেল। মা, বৌ এবং বাচ্চারা ‘ভগবানা’কে জড়িয়ে জড়িয়ে কাঁদল, কিন্তু ভগবানা যে একবার চুপ হল আর কথা বলল না। সাপের বিষে তার সমস্ত শরীর কালো হয়ে গিয়েছিল।
জীবিত মানুষ নগ্নও থাকতে পারে, কিন্তু মৃতকে নগ্ন কীভাবে বিদায় করা যায়? তার জন্য তো বুননের দোকান থেকে নতুন কাপড় আনতেই হবে, তার জন্য মায়ের হাতের ছন্নি-ককনা কেনা না বেচা হোক।
ভগবানা পরলোকে চলে গেল। বাড়িতে যেটুকু চুনি-ভুসি ছিল সেটা তাকে বিদায় করতে খরচ হয়ে গেল। বাপ না থাকলে কী হবে, ছেলেরা সকালে উঠেই ক্ষুধায় ছটফট করতে লাগল। দাদী তাদের খাওয়ার জন্য তরমুজ দিয়ে দিল কিন্তু বৌকে কী দেবে? বৌয়ের শরীর জ্বরে তাওয়ার মতো তপ্ত হচ্ছিল। এখন ছেলে না থাকলে বুড়িকে দুআনি-চব্বিশ আনা পয়সাও কে ধার দেবে।
বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে এবং চোখ মুছতে মুছতে ভগবানার কুড়িয়ে আনা তরমুজ ডলিয়ায় ভরে বাজারের দিকে চলল- আর উপায়ই বা কী ছিল?
বুড়ি তরমুজ বিক্রি করার সাহস করে এসেছিল, কিন্তু মাথায় চাদর জড়িয়ে, মাথা হাঁটুর উপর ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।
কাল যার ছেলে চলে গেল, আজ সে বাজারে সওদা বিক্রি করতে এসেছে, হায় রে পাথর-হৃদয়!
সেই পুত্র-বিয়োগিণীর দুঃখের আন্দাজ করতে গিয়ে গত বছর নিজের পাড়ায় পুত্রের মৃত্যুতে শোকাহত মায়ের কথা ভাবতে লাগল। সেই সম্ভ্রান্ত মহিলা পুত্রের মৃত্যুর পর আড়াই মাস পর্যন্ত বিছানা থেকে উঠতে পারেননি। তাঁকে পনেরো-পনেরো মিনিট পর পুত্র-বিয়োগ থেকে মূর্ছা যেত এবং মূর্ছা না আসা অবস্থায় চোখ থেকে অশ্রু থামানো যেত না। দুই-দুই ডাক্তার সর্বদা শিয়রে বসে থাকতেন। সর্বদা মাথায় বরফ রাখা হত। শহরভর লোকের মন সেই পুত্র-শোকে বিগলিত হয়ে উঠেছিল।
যখন মনকে সূক্ষ্ম পথ না মেলে তখন ব্যাকুলতায় পা দ্রুত হয়ে যায়। সেই অবস্থায় নাক উঁচু করে, রাস্তার চলতি লোকের সাথে ধাক্কা খেতে খেতে আমি চলে যাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম- $ \qquad $ শোক করতে, গম মেনে নিতেও সুবিধা চাই এবং… দুঃখী হওয়ারও একটি অধিকার থাকে।
প্রশ্ন-অভ্যাস
মৌখিক
নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর এক-দুই পংক্তিতে দিন-
1. কোনো ব্যক্তির পোশাক দেখে আমাদের কী জানা যায়?
2. তরমুজ বিক্রি করা মহিলার থেকে কেউ তরমুজ কেন কিনছিল না?
3. সেই মহিলাকে দেখে লেখকের কেমন লাগল?
4. সেই মহিলার ছেলের মৃত্যুর কারণ কী ছিল?
5. বুড়িকে কেউ কেন ধার দিচ্ছিল না?
লিখিত
(ক) নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর ( ২৫-৩০ শব্দে ) লিখুন-
1. মানুষের জীবনে পোশাকের কী গুরুত্ব?
2. পোশাক কখন আমাদের জন্য বন্ধন এবং বাধা হয়ে দাঁড়ায়?
3. লেখক সেই মহিলার কান্নার কারণ কেন জানতে পারলেন না?
4. ভগবানা তার পরিবারের নির্বাহ কীভাবে করত?
5. ছেলের মৃত্যুর পরদিনই বুড়ি তরমুজ বিক্রি করতে কেন বেরিয়ে পড়ল?
6. বুড়ির দুঃখ দেখে লেখকের নিজের পাড়ার সম্ভ্রান্ত মহিলার কথা কেন মনে পড়ল?
( খ ) নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর ( ৫০-৬০ শব্দে ) লিখুন-
1. বাজারের লোকেরা তরমুজ বিক্রি করা মহিলার সম্পর্কে কী কী বলছিল? নিজের শব্দে লিখুন।
2. পাশ-পড়োশের দোকান থেকে জিজ্ঞেস করে লেখক কী জানতে পারলেন?
3. ছেলেকে বাঁচানোর জন্য বুড়ি মা কী কী উপায় করল?
4. লেখক বুড়ির দুঃখের আন্দাজ কীভাবে করলেন?
5. এই পাঠের শিরোনাম ‘দুঃখের অধিকার’ কতটা সার্থক? ব্যাখ্যা করুন।
( গ ) নিম্নলিখিতগুলির আভাস ব্যাখ্যা করুন-
1. যেমন বাতাসের ঢেউ কাটা ঘুড়িকে হঠাৎ মাটিতে পড়তে দেয় না তেমনি বিশেষ পরিস্থিতিতে আমাদের পোশাক আমাদের নুইয়ে পড়তে বাধা দেয়।
2. এদের জন্য ছেলে-মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী, ধর্ম-ঈমান সব রুটির টুকরো।
3. শোক করতে, গম মেনে নিতেও সুবিধা চাই এবং… দুঃখী হওয়ারও একটি অধিকার থাকে।
ভাষা-অধ্যয়ন
1. নিম্নলিখিত শব্দ-সমূহ পড়ুন এবং বুঝুন-
(ক) কङ्घা, পতङ-গ, চক্চল, ঠণ্ডা, সম্বন্ধ।
(খ) কংঘা, পতংগ, চংচল, ঠংডা, সংবন্ধ।
(গ) অক্ষুণ্ণ, সম্মিলিত, দুঅন্নি, চবন্নি, অন্ন।
(ঘ) সংশয়, সংসদ, সংরচনা, সংবাদ, সংহার।
(ঙ) অঁধেরা, বাঁট, মুঁহ, ঈঁট, মহিলাএঁ, মেঁ, মৈঁ।
মনোযোগ দাও যে ড়, জ্, ণ্, ন্ এবং ম্ এই পাঁচটি পঞ্চমাক্ষর বলা হয়। এগুলির লেখার পদ্ধতি তুমি উপরে দেখেছ- এই রূপে বা অনুস্বারের রূপে। এগুলি দুটির যেকোনো একটি পদ্ধতিতে লেখা যেতে পারে এবং দুটিই শুদ্ধ। হ্যাঁ, একটি পঞ্চমাক্ষর যখন দুবার আসে তখন অনুস্বারের প্রয়োগ হবে না; যেমন- অম্মা, অন্ন ইত্যাদি। একইভাবে এগুলির পরে যদি অন্তস্থ য, র, ল, ব এবং ঊষ্ম শ, ষ, স, হ ইত্যাদি থাকে তবে অনুস্বারের প্রয়োগ হবে, কিন্তু তার উচ্চারণ পঞ্চম বর্ণগুলির যেকোনো একটি বর্ণের মতো হতে পারে; যেমন- সংশয়, সংরচনায় ‘ন্’, সংবাদে ‘ম্’ এবং সংহারে ‘ড্’ ।
( ং ) এটি অনুস্বারের চিহ্ন এবং ( ঁ ) এটি অনুনাসিকের চিহ্ন। এগুলিকে যথাক্রমে বিন্দু এবং চন্দ্র-বিন্দুও বলা হয়। দুটির প্রয়োগ এবং উচ্চারণে পার্থক্য আছে। অনুস্বারের প্রয়োগ ব্যঞ্জনের সাথে হয় অনুনাসিকের স্বরের সাথে।
2. নিম্নলিখিত শব্দগুলির প্রতিশব্দ লিখুন-
ঈমান $\qquad $ ……..
বদন $\qquad $ ……..
অন্দাজা $\qquad $ ……..
বেচৈনি $\qquad $ ……..
গম $\qquad $ ……..
দরজা $\qquad $ ……..
জমিন $\qquad $ ……..
জমানা $\qquad $ ……..
বরকত $\qquad $ ……..
3. নিম্নলিখিত উদাহরণের মতো পাঠে আসা শব্দ-যুগ্মগুলি বাছাই করে লিখুনউদাহরণ : ছেলে-মেয়ে
4. পাঠের প্রসঙ্গ অনুযায়ী নিম্নলিখিত বাক্যাংশগুলির ব্যাখ্যা করুন-
বন্ধ দরজা খুলে দেওয়া, নির্বাহ করা, ক্ষুধায় ছটফট করা, কোনো উপায় না থাকা, শোকে বিগলিত হয়ে যাওয়া।
5. নিম্নলিখিত শব্দ-যুগ্ম এবং শব্দ-সমূহের নিজের বাক্যে প্রয়োগ করুন-
(ক) ছন্নি-ককনা $\qquad $ আড়াই-মাস $\qquad $ পাশ-পড়োশ
দুআনি-চব্বিশ আনা $\qquad $ ভোরের অন্ধকারে $\qquad $ ঝাড়-ফুঁক
(খ) ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে $\qquad $ বিলাপ করে করে
ছটফট করে করে $\qquad $ জড়িয়ে জড়িয়ে
6. নিম্নলিখিত বাক্য গঠনগুলি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন এবং এই ধরনের আরও কিছু বাক্য তৈরি করুন :
(ক) 1. ছেলেরা সকালে উঠেই ক্ষুধায় ছটফট করতে লাগল।
2. তার জন্য তো বুননের দোকান থেকে কাপড় আনতেই হবে।
3. তার জন্য মায়ের হাতের ছন্নি-ককনা কেনা না বেচা হোক।
(খ) 1. আরে যেমন নিয়ত হয়, আল্লাহও তেমনই বরকত দেন।
2. ভগবানা যে একবার চুপ হল আর কথা বলল না।
যোগ্যতা-বিস্তার
1. ‘ব্যক্তির পরিচয় তার পোশাক থেকে হয়।’ এই বিষয়ে ক্লাসে আলোচনা করুন।
2. যদি আপনি ভগবানার মায়ের মতো কোনো দুঃখীকে দেখে থাকেন তবে তার গল্প লিখুন।
3. জানুন যে কোন কোন সাপ বিষাক্ত হয়? তাদের ছবি সংগ্রহ করুন এবং প্রাচীর পত্রিকায় লাগান।
শব্দার্থ এবং টিপ্পনী
| পোশাক | - | বস্ত্র, পরিধান |
|---|---|---|
| অনুভূতি | - | অনুভব |
| বাধা | - | বিঘ্ন, রুক্ষতা, প্রতিবন্ধকতা |
| মধ্যবয়সী | _ | অর্ধেক বয়সের, ঢলতে বয়সের |
| ব্যথা | যন্ত্রণা, দুঃখ | |
| বাধা | _ | রুক্ষতা, প্রতিবন্ধকতা |
| বেহায়া | - | নির্লজ্জ, নিঃসংকোচ |
| নিয়ত | - | ইচ্ছা, অভিপ্রায় |
| বরকত | - | বৃদ্ধি, লাভ, সৌভাগ্য |
| স্বামী | - | পতি |
| স্ত্রী | - | পত্নী |
| পারচুনের দোকান | - | আটা, চাল, ডাল ইত্যাদির দোকান |
| সূতক | - | পরিবারে কোনো শিশুর জন্ম হলে বা কারো মৃত্যু হলে |
| কিছু নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পরিবারের লোকদের না ছোঁয়া, ছোঁয়াচ | ||
| শাকসবজির চাষ | - | ক্ষেতে সবজি বপন করা |
| নির্বাহ | - | গুজরান |
| মেড | - | ক্ষেতের চারদিকে মাটি দিয়ে তৈরি ঘেরা, দুটি ক্ষেত |
| এর মাঝের সীমানা | ||
| শীতলতা | - | ভেজাভাব, আর্দ্রতা, শৈত্য, ঠাণ্ডা |
| ওঝা | - | ঝাড়-ফুঁক করা ব্যক্তি |
| ছন্নি-ককনা | - | সাধারণ গহনা, অলঙ্কার |
| সুবিধা | - | সহজতা |