অধ্যায় ০১ মাতার আঁচল
শিবপূজন সাহায্য
সন্ ১৮৯৩-১৯৬৩
শিবপূজন সাহায্যের জন্ম সন্ ১৮৯৩ সালে গ্রাম উনভাঁস, জেলা ভোজপুর (বিহার) এ হয়েছিল। তাঁর বাল্যকালের নাম ছিল ভোলানাথ। দশম শ্রেণীর পরীক্ষা পাস করার পর তিনি বেনারসের আদালতে নকলনবিশের চাকরি করেছিলেন। পরে তিনি হিন্দির অধ্যাপক হয়ে যান। অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাবে তিনি সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। শিবপূজন সাহায্য তাঁর সময়ের লেখকদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় এবং সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি জাগরণ, হিমালয়, মাধুরী, বালক ইত্যাদি কয়েকটি প্রসিদ্ধ পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। এর সাথে তিনি হিন্দির প্রসিদ্ধ পত্রিকা মতবালার সম্পাদক-মণ্ডলে ছিলেন। সন্ ১৯৬৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
তিনি প্রধানত গদ্যের লেখক ছিলেন। দেহাতি দুনিয়া, গ্রাম সুধার, ওই দিন ওই লোক, স্মৃতিশেষ ইত্যাদি তাঁর ডজনখানেক গদ্য-রচনা প্রকাশিত হয়েছে। শিবপূজন রচনাবলীর চার খণ্ডে তাঁর সমস্ত রচনা প্রকাশিত আছে। তাঁর রচনায় লোকজীবন এবং লোকসংস্কৃতির প্রসঙ্গ সহজেই পাওয়া যায়।
মাতার আঁচল

যেখানে ছেলেদের সঙ্গ, সেখানে বাজে মৃদঙ্গ
যেখানে বুড়োদের সঙ্গ, সেখানে খরচের টান
আমাদের পিতা ভোর সকালে উঠে, কাজ সেরে স্নান করে পূজা করতে বসে যেতেন। আমরা শৈশব থেকেই তাঁর সঙ্গে লেগে থাকতাম। মাতার সাথে কেবল দুধ পান করার সম্পর্ক ছিল। তাই পিতার সাথেই আমরা বাইরের বৈঠকখানাতেই ঘুমাতাম। তিনি তাঁর সাথে আমাদেরও তুলে নিতেন এবং সাথে নিয়েই স্নান করিয়ে পূজায় বসিয়ে দিতেন। আমরা ভস্মের তিলক লাগিয়ে দেবার জন্য তাঁকে বিরক্ত করতে শুরু করতাম। কিছু হেসে, কিছু বিরক্ত হয়ে এবং কিছু ধমক দিয়ে তিনি আমাদের চওড়া কপালে ত্রিপুণ্ড করতেন। আমাদের কপালে ভস্ম খুব ফুটে উঠত। মাথায় লম্বা লম্বা জটা ছিল। ভস্ম মাখাতে আমরা বেশ ‘বম-ভোলা’ হয়ে যেতাম।
পিতা জি আমাদের খুব স্নেহে ‘ভোলানাথ’ বলে ডাকতেন। কিন্তু আসলে আমাদের নাম ছিল ‘তারকেশ্বরনাথ’। আমরাও তাঁকে ‘বাবু জি’ বলে ডাকতাম এবং মাতাকে ‘মইয়াঁ’।
যখন বাবু জি রামায়ণ পাঠ করতেন তখন আমরা তাঁর পাশে বসে বসে আয়নায় নিজের মুখ দেখতাম। যখন তিনি আমাদের দিকে তাকাতেন তখন আমরা কিছু লজ্জা পেয়ে এবং মুচকি হেসে আয়না নিচে রাখতাম। তিনিও মুচকি হাসতেন।
পূজা-পাঠ শেষ করার পর তিনি রাম-রাম লিখতে শুরু করতেন। তাঁর একটি ‘রামনামা বহি’তে হাজার রাম-নাম লিখে তিনি তাকে পাঠ করার পুঁথির সাথে বেঁধে রাখতেন। তারপর

পাঁচশো বার কাগজের ছোট ছোট টুকরোতে রাম-নাম লিখে আটার গোলিতে মুড়ে দিতেন এবং সেই গোলিগুলো নিয়ে গঙ্গা জির দিকে রওনা হতেন।
সেই সময়ও আমরা তাঁর কাঁধে বসে থাকতাম। যখন তিনি গঙ্গায় এক একটি আটার গোলি ফেলে মাছদের খাওয়াতে শুরু করতেন তখনও আমরা তাঁর কাঁধেই বসে বসে হাসতাম। যখন তিনি মাছদের খাবার দিয়ে বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করতেন তখন পথের মাঝে ঝুঁকে থাকা গাছের ডালে আমাদের বসিয়ে দোলা দিতেন।
কখনো কখনো বাবু জি আমাদের সাথে কুস্তিও লড়তেন। তিনি শিথিল হয়ে আমাদের শক্তিকে উৎসাহ দিতেন এবং আমরা তাঁকে ফেলে দিতাম। তিনি চিৎ হয়ে পড়ে যেতেন এবং আমরা তাঁর বুকের উপর চড়ে বসতাম। যখন আমরা তাঁর লম্বা লম্বা গোঁফ টানতে শুরু করতাম তখন তিনি হেসে হেসে আমাদের হাত গোঁফ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সেগুলো চুমু খেতেন। তারপর যখন আমাদের থেকে টক এবং মিষ্টি চুম্বন চাইতেন তখন আমরা পালা করে আমাদের বাঁ এবং ডান গাল তাঁর মুখের দিকে ফিরিয়ে দিতাম। বাঁ দিকের টক চুম্বন নিয়ে যখন তিনি ডান দিকের মিষ্টি চুম্বন নিতে যেতেন তখন তাঁর দাড়ি বা গোঁফ আমাদের কোমল গালে গেঁথে দিতেন। আমরা বিরক্ত হয়ে আবার তাঁর গোঁফ টানতে শুরু করতাম। এতে তিনি কৃত্রিম কান্না কাঁদতে শুরু করতেন এবং আমরা আলাদা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসতে শুরু করতাম।
তাঁর সাথে হেসে হেসে যখন আমরা বাড়ি আসতাম তখন তাঁর সাথেই আমরা চৌকিতে খেতে বসতাম। তিনি আমাদের নিজের হাত দিয়ে, ফুলের একটি কাটোরে গোরস এবং ভাত মিশিয়ে খাওয়াতেন। যখন আমরা খেয়ে ফুলে যেতাম তখন মইয়াঁ আরও কিছু খাওয়ানোর জন্য জিদ করতেন। তিনি বাবু জিকে বলতে শুরু করতেন-আপনি তো চার-চার দানার গ্রাস বাচ্চার মুখে দিয়ে যান; এতে সে অল্প খেলেও মনে করে যে আমরা অনেক খেয়েছি; আপনি খাওয়ানোর ধরণ জানেন না-বাচ্চাকে ভর্তি মুখ গ্রাস খাওয়ানো উচিত।
যখন খাবে বড় বড় গ্রাস, তখন পাবে দুনিয়ায় ঠাঁই।
-দেখুন, আমি খাওয়াই। পুরুষেরা কি জানে যে বাচ্চাদের কীভাবে খাওয়ানো উচিত, আর মায়ের হাত থেকে খেলে বাচ্চাদের পেটও ভরে।
এ কথা বলে তিনি থালিতে দই-ভাত মিশাতেন এবং আলাদা আলাদা টিয়া, ময়না, কবুতর, হাঁস, ময়ূর ইত্যাদির কৃত্রিম নাম দিয়ে গ্রাস বানিয়ে এ কথা বলে খাওয়াতেন যে তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও, নাহলে উড়ে যাবে; কিন্তু আমরা সেগুলো এত তাড়াতাড়ি উড়িয়ে দিতাম যে উড়বার সুযোগই পেত না।
যখন আমরা সব কৃত্রিম পাখিগুলো গিলে ফেলতাম তখন বাবু জি বলতে শুরু করতেন-ঠিক আছে, এখন তুমি ‘রাজা’ হও, যাও খেলো।
বস, আমরা উঠে লাফালাফি করতে শুরু করতাম। তারপর দড়িতে বাঁধা কাঠের ঘোড়া নিয়ে ন্যাংটো বাইরে গলিতে বেরিয়ে যেতাম।
যখন কখনো মইয়াঁ আমাদের হঠাৎ ধরে ফেলতে পারত তখন আমাদের লক্ষ চেষ্টা সত্ত্বেও এক চুল্লু তেতো তেল আমাদের মাথায় ঢেলে দিতেন। আমরা কাঁদতে শুরু করতাম এবং বাবু জি তাতে রেগে উঠতেন; কিন্তু তিনি আমাদের মাথায় তেল মাখিয়ে আমাদের ঘষে ছাড়তেন। তারপর আমাদের নাভি এবং কপালে কাজলের বিন্দি লাগিয়ে চুটি বেঁধে তাতে ফুলদার লট্টু বেঁধে রঙিন কুর্তা-টুপি পরিয়ে দিতেন। আমরা বেশ ‘কানাইয়া’ হয়ে বাবু জির কোলে হুঁচকি হুঁচকি করে বাইরে আসতাম।
বাইরে আসতেই আমাদের অপেক্ষা করছিল ছেলেদের একটি দল। আমরা সেই খেলার সাথীদের দেখামাত্র, হুঁচকি ভুলে, বাবু জির কোলে থেকে নেমে পড়তাম এবং নিজের সমবয়সীদের দলে মিশে তামাশা করতে শুরু করতাম।
তামাশাও এমনি-তেমন নয়, নানা রকমের নাটক! চবুতরার একটি কোণই নাটক-ঘর হত। বাবু জি যে ছোট চৌকিতে বসে স্নান করতেন, সেটাই রঙ্গমঞ্চ হত। সেই স্টেজেই সরকান্ডার খুঁটিতে কাগজের চাঁদোয়া টাঙিয়ে, মিষ্টির দোকান বসানো হত। তাতে চিলমের খোঁচায় কাপড়ের থালায় ঢেলার লাড্ডু, পাতার পুরি-কচুরি, ভেজা মাটির জিলাপি, ফাটা ঘড়ের টুকরোর বাতাশা ইত্যাদি মিষ্টি সাজানো হত। ভাঙা মাটির পাত্রের বাটখারা এবং দস্তার ছোট ছোট টুকরোর পয়সা বানানো হত। আমরাই ক্রেতা এবং আমরাই দোকানদার। বাবু জিও দুই-চার গোরখপুরিয়া পয়সা কিনে নিতেন।
অল্পক্ষণে মিষ্টির দোকান বাড়িয়ে আমরা লোকেরা ঘরোন্দা বানাতাম। ধুলোর মেঁড় দেয়াল হত এবং তৃণের ছাউনি। দাঁতনের খুঁটি, দিয়াশলাইয়ের বাক্সের দরজা, ঘড়ের মুখের চুলা-চাকি, দিয়ের কড়াই এবং বাবু জির পূজার আচমনী কুলচি হত। পানির ঘি, ধুলোর আটা এবং বালুর চিনি দিয়ে আমরা লোকেরা ভোজ প্রস্তুত করতাম। আমরাই লোকেরা ভোজ করতাম এবং আমরাই লোকেদের ভোজ বসত। যখন সারি বসে যেত তখন বাবু জিও ধীরে ধীরে এসে, সারির শেষে, খাওয়ার জন্য বসে যেতেন। তাঁকে বসতে দেখামাত্র আমরা লোকেরা হেসে এবং ঘরোন্দা ভেঙে দৌড়ে চলে যেতাম। তিনিও হেসে হেসে লুটোপুটি হয়ে যেতেন এবং বলতে শুরু করতেন-আবার কখন ভোজ হবে ভোলানাথ?
কখনো কখনো আমরা লোকেরা বরাতেরও মিছিল বের করতাম। ক্যানিস্টারের তানপুরা বাজত, আমলার রস ঘষে শানাই বাজানো হত, ভাঙা ইঁদুরদানির পালকি হত, আমরা সমধি হয়ে ছাগলের উপর চড়ে বসতাম এবং চবুতরার একটি কোণ থেকে চলে বরাত অন্য কোণে গিয়ে দরজায় লাগত। সেখানে কাঠের পাটাতন দিয়ে ঘেরা, গোবর দিয়ে লিপা, আম এবং কলার ডাল দিয়ে সাজানো ছোট আঙিনায় কুলচির কলস রাখা থাকত। সেখানেই পৌঁছে বরাত আবার ফিরে আসত। ফিরবার সময়, খাটুলিতে লাল ওড়না দিয়ে, তাতে দুলহিনকে চড়িয়ে নেওয়া হত। ফিরে এসে বাবু জি যেই ওড়না সরিয়ে দুলহিনের মুখ দেখতে শুরু করতেন, অমনি আমরা লোকেরা হেসে দৌড়ে যেতাম।
অল্পক্ষণ পরে আবার ছেলেদের মণ্ডলী জুটে যেত। একত্র হলে রায় বসত যে চাষ করা হোক। বস, চবুতরার প্রান্তে ঘিরনি গাড়া হত এবং তার নিচের গলি কুয়া হয়ে যেত। মুঞ্জের বাটা পাতলা দড়িতে একটি চুক্কড় বেঁধে গরাড়িতে চড়িয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হত এবং দুটি ছেলে বলদ হয়ে ‘মোট’ টানতে শুরু করত। চবুতরা ক্ষেত হত, নুড়ি বীজ এবং ঠেঙ্গা লাঙ্গল-জোয়াল। বড় কষ্টে ক্ষেত চাষ-বপন এবং সমতল করা হত। ফসল তৈরি হতে দেরি লাগত না এবং আমরা হাতে হাতে ফসল কেটে নিতাম। কাটার সময় গাইতাম-
উঁচু নিচু মাঝে বয়ে কিয়ারী, যা উৎপন্ন হল তাই হল আমাদের।
ফসলকে এক জায়গায় রেখে তাকে পায়ে দলে ফেলতাম। কাসোরের চালুনি বানিয়ে ফুঁকতাম এবং মাটির দিয়ের তুলাদণ্ডে তৌল করে রাশি তৈরি করে দিতাম। এই সময় বাবু জি এসে জিজ্ঞেস করে বসতেন-এই বছরের চাষ কেমন হল ভোলানাথ?
বস, তারপর আর কী, আমরা লোকেরা যেমন-তেমন ক্ষেত-খলিহান ফেলে হেসে দৌড়ে যেতাম। কী মজার চাষ ছিল।
এমনি এমনি নাটক আমরা লোকেরা নিয়মিত খেলতাম। পথিকরাও কিছুক্ষণ থমকে আমাদের লোকেদের তামাশা দেখে নিত।
যখন কখনো আমরা লোকেরা দদরির মেলায় যাওয়া লোকেদের দল দেখতে পেতাম তখন লাফিয়ে লাফিয়ে চেঁচাতে শুরু করতাম-
চলো ভাইয়ো দদরি, সাতু আটার মোটরি।
যদি কোনো দুল্লার আগে আগে যাওয়া ওড়নাদার পালকি দেখতে পেতাম, তখন খুব জোরে চেঁচাতে শুরু করতাম-
রহরি মে রহরি পুরান রহরি, ডোলার কনিয়া হামার মেহরি।
এতে একবার বুড়ো বর আমাদের লোকেদের অনেক দূর পর্যন্ত তাড়িয়ে ঢিল দিয়ে মেরেছিল। সেই খসুট-খব্বিসের চেহারা আজও আমাদের মনে আছে। জানি না কোন শ্বশুর এমন জামাই খুঁজে বের করেছিল। এমন ঘোড়া মুখো লোক আমরা কখনো দেখিনি।
আমের ফসলের সময় কখনো কখনো প্রচণ্ড ঝড় আসে। ঝড়ের কিছু দূর চলে যাওয়ার পর আমরা লোকেরা বাগানের দিকে দৌড়ে পড়তাম। সেখানে বাছাই বাছাই করে পাকা পাকা ‘গোপী’ আম চিবাতাম।
একদিনের কথা, ঝড় এল এবং থেমে গেল। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল। মেঘ গর্জন করতে লাগল। বিদ্যুৎ চমকাতে এবং ঠাণ্ডা বাতাস সাঁ সাঁ করতে লাগল। গাছ দুলতে এবং মাটি চুম্বন করতে লাগল। আমরা লোকেরা চিৎকার করে উঠলাম-
এক পয়সার লাই, বাজারে ছিটরাই, বরখা উধরে বিলাই।
কিন্তু বৃষ্টি থামল না; আরও মুষলধার বৃষ্টি হতে লাগল। আমরা লোকেরা গাছের গোড়ার সাথে শরীর সেঁটে গেলাম, যেমন কুকুরের কানে অঁঠই লেগে যায়। কিন্তু বৃষ্টি জমল না, থেমে গেল।
বৃষ্টি বন্ধ হতেই বাগানে অনেক বিছু দেখা গেল। আমরা লোকেরা ভয়ে দৌড়ে চলে গেলাম। আমরা লোকেদের মধ্যে বৈজু বড় দুষ্টু ছিল। কাকতালীয় ব্যাপার, মাঝে মুসন তিওয়ারি মিলে গেলেন। বেচারা বুড়ো লোকের বুদ্ধি কম ছিল। বৈজু তাকে চটিয়ে বলল-
বুঢ়া বেইমান মাগে করৈলা কা চোখা।
আমরা লোকেরাও, বৈজুর সুরে সুর মিলিয়ে এটাই চেঁচানো শুরু করলাম। মুসন তিওয়ারি বেতহাশা তাড়া করলেন। আমরা লোকেরা তো বাস নিজের নিজের বাড়ির দিকে ঝড়ের মতো চলে গেলাম।
যখন আমরা লোকেরা ধরা না পড়লাম তখন তিওয়ারি জি সোজা পাঠশালায় চলে গেলেন। সেখান থেকে আমাদের এবং বৈজুকে ধরে আনার জন্য চার ছেলে ‘গ্রেফতারি ওয়ারেন্ট’ নিয়ে ছুটল। এদিকে যেই আমরা লোকেরা বাড়ি পৌঁছলাম, অমনি গুরু জির সিপাহিরা আমাদের লোকেদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বৈজু তো নৌ-দো গ্যারে হয়ে গেল; আমরা ধরা পড়লাম। তারপর তো গুরু জি আমাদের খুব খবর নিলেন।
বাবু জি এই অবস্থা শুনলেন। তিনি দৌড়ে পাঠশালায় এলেন। কোলে তুলে আমাদের আদর করতে এবং মিনতি করতে লাগলেন। কিন্তু আমরা আদরে চুপ হওয়ার ছেলে ছিলাম না। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর কাঁধ অশ্রুতে ভিজিয়ে দিলাম। তিনি গুরু জির কাছে কাকুতি মিনতি করে আমাদের বাড়ি নিয়ে চলে গেলেন। পথে আবার আমাদের সাথী ছেলেদের দল মিলল। তারা জোরে নাচছিল এবং গাইছিল-
মাই পাকাই গরর-গরর পুয়া, হাম খাইব পুয়া, না খেলব জুয়া।
তারপর আর কী ছিল, আমাদের কান্না-ধোঁয়া ভুলে গেলাম। আমরা জিদ করে বাবু জির কোলে থেকে নেমে পড়লাম এবং ছেলেদের মণ্ডলীতে মিশে সেই তান-সুর আলাপন করতে লাগলাম। তখন পর্যন্ত সব ছেলে সামনের ভুট্টার ক্ষেতে দৌড়ে পড়ল। তাতে পাখিদের দল চরছিল। তারা দৌড়ে দৌড়ে তাদের ধরতে লাগল, কিন্তু একটি ও হাতে এল না। আমরা ক্ষেত থেকে আলাদাই দাঁড়িয়ে গাইছিলাম-
রাম জি কি চিরই, রাম জি কা খেত, খা লো চিরই, ভর-ভর পেট।
আমাদের থেকে কিছু দূরে বাবু জি এবং আমাদের গ্রামের কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলেন এবং এটাই বলে হাসছিলেন যে ‘পাখির প্রাণ যাক, ছেলেদের খেলনা’। সত্যিই ‘ছেলে এবং বানর পরের ব্যথা বোঝে না।
একটি টিলায় গিয়ে আমরা লোকেরা ইঁদুরের গর্ত থেকে জল তুলতে লাগলাম।
নিচ থেকে উপরে জল ফেলা ছিল। আমরা সবাই ক্লান্ত হয়ে গেলাম। তখন পর্যন্ত গণেশ জির ইঁদুরের রক্ষার জন্য শিব জির সাপ বেরিয়ে এল। কাঁদতে-চেঁচাতে আমরা লোকেরা বেতহাশা দৌড়ে চলে গেলাম! কেউ উপুড় হয়ে পড়ল, কেউ উল্টোপাল্টা। কারো মাথা ফুটল, কারো দাঁত ভাঙল। সবাই পড়তে পড়তে দৌড়ল। আমাদের সমস্ত শরীর রক্তাক্ত হয়ে গেল। পায়ের তলায় কাঁটায় ছেঁদা হয়ে গেল।

আমরা এক সুরে দৌড়ে এলাম এবং বাড়িতে ঢুকে গেলাম। সেই সময় বাবু জি বৈঠকখানার বারান্দায় বসে হুঁকা টানছিলেন। তিনি আমাদের অনেক ডাকলেন কিন্তু তাঁর কথা না শুনে আমরা দৌড়ে মইয়াঁর কাছেই চলে গেলাম। গিয়ে তারই কোলে আশ্রয় নিলাম।
‘মইয়াঁ’ চাল আমনিয়া করছিলেন। আমরা তারই আঁচলে লুকিয়ে গেলাম। আমাদের ভয়ে কাঁপতে দেখে তিনি জোরে কাঁদতে শুরু করলেন এবং সব কাজ ছেড়ে বসলেন। অধীর হয়ে আমাদের ভয়ের কারণ জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। কখনো আমাদের শরীর জড়িয়ে ধরে চেপে ধরতেন এবং কখনো আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিজের আঁচল দিয়ে মুছে আমাদের চুমু খেতেন। বড় বিপদে পড়ে গেলেন।
ঝটপট হলুদ পিষে আমাদের ক্ষতস্থানে চাপা দেওয়া হল। বাড়িতে কোলাহল পড়ে গেল। আমরা কেবল মৃদু সুরে “সাঁ…স…সাঁ” বলে মইয়াঁর আঁচলে লুকিয়ে যেতে থাকতাম। সমস্ত শরীর থরথর কাঁপছিল। রোমাঞ্চিত হয়ে গিয়েছিল। আমরা চোখ খুলতে চাইতাম; কিন্তু সেগুলো খুলত না। আমাদের কাঁপতে থাকা ঠোঁটকে মইয়াঁ বার বার দেখে কাঁদতেন এবং খুব আদরে আমাদের গলা জড়িয়ে ধরতেন।
এই সময় বাবু জি দৌড়ে এলেন। এসে ঝট করে আমাদের মইয়াঁর কোলে থেকে নিজের কোলে নিতে লাগলেন। কিন্তু আমরা মইয়াঁর আঁচলের-প্রেম এবং শান্তির চাঁদোয়ার-ছায়া ছাড়লাম না…।
প্রশ্ন-অভ্যাস
1. প্রস্তুত পাঠের ভিত্তিতে এটা বলা যেতে পারে যে বাচ্চার নিজের পিতার সাথে বেশি যোগাযোগ ছিল, তবুও বিপদের সময় সে পিতার কাছে না গিয়ে মায়ের আশ্রয় নেয়। আপনার বোঝার মতে এর কী কারণ হতে পারে?
2. আপনার মতে ভোলানাথ তার সাথীদের দেখে হুঁচকি কেন ভুলে যায়?
3. আপনি দেখেছেন যে ভোলানাথ এবং তার সাথীরা যখন-তখন খেলে-খেতে সময় কোনো না কোনো ধরনের ছড়া কাটে। আপনার যদি আপনার খেলা ইত্যাদির সাথে জড়িত ছড়া মনে থাকে তবে লিখুন।
4. ভোলানাথ এবং তার সাথীদের খেলা এবং খেলার সামগ্রী আপনার খেলা এবং খেলার সামগ্রী থেকে কীভাবে ভিন্ন?
5. পাঠে আসা এমন প্রসঙ্গের বর্ণনা করুন যা আপনার হৃদয় স্পর্শ করে গেছে?
6. এই উপন্যাসাংশে ত্রিশের দশকের গ্রাম্য সংস্কৃতির চিত্রণ আছে। আজকের গ্রামীণ সংস্কৃতিতে আপনি কী ধরনের পরিবর্তন দেখতে পান।
7. পাঠ পড়তে পড়তে আপনিও আপনার মাতা-পিতার আদর-স্নেহ মনে পড়ছে। আপনার এই অনুভূতিগুলো ডায়েরিতে লিখুন।
8. এখানে মাতা-পিতার বাচ্চার প্রতি যে স্নেহ প্রকাশিত হয়েছে তাকে নিজের শব্দে লিখুন।
9. মাতার আঁচল শিরোনামের উপযুক্ততা বোঝাতে অন্য কোনো শিরোনাম প্রস্তাব করুন।
10. বাচ্চারা মাতা-পিতার প্রতি নিজের প্রেমকে কীভাবে প্রকাশ করে?
11. এই পাঠে বাচ্চাদের যে দুনিয়া রচিত হয়েছে তা আপনার শৈশবের দুনিয়া থেকে কীভাবে ভিন্ন?
12. ফণীশ্বরনাথ রেণু এবং নাগার্জুনের আঞ্চলিক রচনাগুলো পড়ুন।